আজকাল ফেসবুক আমাদের জীবনের একটা বড় অংশ হয়ে গেছে। কেনাকাটা, ইনভেস্টমেন্ট, চাকরির খবর—সবই এখন ফেসবুক পেজের মাধ্যমে পাওয়া যায়। কিন্তু সমস্যা হলো, এই সুবিধার সুযোগ নিয়েই অনেক অসাধু মানুষ ফেসবুক পেজ খুলে প্রতারণা করছে। কেউ দিচ্ছে অবিশ্বাস্য ডিসকাউন্ট, কেউ আবার অল্প টাকায় বড় লাভের লোভ দেখাচ্ছে।
অনেক সময় আমরা বুঝতেই পারি না—যে পেজটাকে বিশ্বাস করছি, সেটাই আসলে আমাদের সাথে স্ক্যাম করছে। ফলাফল? টাকা যায়, পণ্য আসে না, শেষে আর যোগাযোগও থাকে না। তাই ফেসবুক ব্যবহার করার পাশাপাশি স্ক্যাম চিনতে জানাটাও এখন খুব জরুরি। এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় জানবো—ফেসবুক পেজ থেকে প্রতারণা চিনবেন যে ৫টা নিশ্চিত উপায়ে। এই ৫টা বিষয় মাথায় রাখলে আপনিও সহজেই বুঝতে পারবেন কোন পেজটা আসল আর কোনটা ফাঁদ।

ফেসবুক স্ক্যাম থেকে বাঁচার ৫টি সহজ উপায়
আজকাল ফেসবুক খুললেই চোখে পড়ে নানা রকম ঝলমলে পোস্ট। কোথাও লেখা থাকে বিশাল ডিসকাউন্ট, কোথাও সীমিত সময়ের অফার, কোথাও আবার অল্প টাকায় বড় লাভের ইনভেস্টমেন্টের প্রলোভন। কোনো পেজ বলছে “আজই অর্ডার করলে ফ্রি গিফট”, কেউ আবার দাবি করছে—এমন সুযোগ আর কোনোদিন আসবে না। এসব দেখে আমাদের অনেকেরই মনে হয়, সুযোগটা না নিলে বুঝি বড় কিছু হাতছাড়া হয়ে যাবে।
কিন্তু এই সুন্দর সুন্দর পোস্টগুলোর আড়ালেই লুকিয়ে থাকে অনেক ফাঁদ। বাস্তবতা হলো, সব ফেসবুক পেজ কিন্তু সৎ বা বিশ্বাসযোগ্য নয়। অনেক পেজ আছে যেগুলো শুধু মানুষের বিশ্বাস অর্জন করার জন্য বানানো হয়, আর সুযোগ পেলেই টাকা হাতিয়ে নেয়। আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না—কখন একটা সাধারণ অফার আমাদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ঠিক এই জায়গাতেই সচেতন হওয়াটা সবচেয়ে জরুরি। ফেসবুক ব্যবহার করা খারাপ নয়, কিন্তু চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করলেই সমস্যা শুরু হয়। তাই এই লেখা/ভিডিওতে আমি আপনাদের খুব সহজ ভাষায় দেখাবো—ফেসবুক পেজ থেকে প্রতারণা চিনবেন ঠিক কোন ৫টা লক্ষণে। এই লক্ষণগুলো জানলে আপনি আগেই বুঝতে পারবেন কোন পেজটা আসল আর কোনটা নিছক স্ক্যাম।
অস্বাভাবিক লোভনীয় অফার
ফেসবুক খুললেই চোখে পড়ে দারুণ সব অফার। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো পেজ বলে—“১০ হাজার টাকার জিনিস মাত্র ৯৯৯ টাকায়!” বা “আজই অর্ডার করলে ফ্রি গিফট!” এমন অফার শুনে আমাদের মনে হয়—এটা তো বিশ্বাসের বাইরে, কিন্তু সত্যি হলে দারুণ সুযোগ।
আরও ভয়াবহ হলো, কিছু পেজ সময়সীমা দিয়ে চাপ তৈরি করে। “মাত্র আজই, কাল শেষ!”—এ ধরনের জোর বা তাড়া অনেকেই পড়েন। ফলে আমরা হু হু করে টাকা পাঠিয়ে দিই, আর পরে বুঝি—পণ্য আসেনি, যোগাযোগও বন্ধ। বাস্তব উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কয়েক মাস আগে একটি নতুন ফেসবুক পেজ বলছিল ১৫ হাজার টাকার হেডফোন মাত্র ১,২০০ টাকায়। অনেকেই বিশ্বাস করে অর্ডার করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পণ্য পাওয়া যায়নি।
মেসেজ: যা সত্যি হতে খুব ভালো শোনায়, সেটাই সাধারণত সবচেয়ে বড় ফাঁদ।
অতএব, খুব লোভনীয় অফার দেখলে প্রথমে ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি—পেজের রিভিউ, অন্যান্য ব্যবহারকারীর মন্তব্য, অফিসিয়াল ওয়েবসাইট সব মিলিয়ে দেখতে হবে।
পেজের তথ্য অসম্পূর্ণ বা সন্দেহজনক
অনেক সময় আমরা দেখি, কোনো ফেসবুক পেজ খুবই বড় দেখায়—হাজার হাজার ফলোয়ার, পোস্টগুলো ঝলমলে এবং আকর্ষণীয়। কিন্তু পেজের About Section ফাঁকা থাকে, ফোন নম্বর নেই, ঠিকানাও দেওয়া হয়নি। অনেক সময় নতুন পেজ হলেও হাজার হাজার ফলোয়ার দেখিয়ে আমাদের বিশ্বাস জাগানোর চেষ্টা করে। এমন পেজে কনফার্ম করা খুব জরুরি। আসল ব্যবসা সাধারণত সব তথ্য খোলাখুলি দিয়ে দেয়—ঠিকানা, ফোন নম্বর, অফিস টাইম। কিন্তু স্ক্যামাররা সবসময় তথ্য লুকিয়ে রাখে, যাতে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না।
মেসেজ: আসল ব্যবসা লুকিয়ে থাকে না, স্ক্যামাররা থাকে।
অতএব, কোনো পেজে অর্ডার করার আগে সব তথ্য পরীক্ষা করা আবশ্যক। About, Contact, Review সবই ভালোভাবে দেখুন।
কমেন্ট বন্ধ বা নেগেটিভ কমেন্ট ডিলিট
অনেক ফেসবুক পেজে দেখা যায়, পোস্টের কমেন্ট অপশন বন্ধ থাকে, বা শুধু নিজেরাই প্রশংসামূলক কমেন্ট দেয়। সাধারণ ব্যবহারকারীরা যখন কোনো প্রশ্ন বা অভিযোগ করেন, সেটা হয়তো সরাসরি পোস্টে দেখানো হয় না, কিংবা ডিলিট হয়ে যায়। এছাড়া, কিছু পেজই ব্যবহারকারীদের প্রশ্ন করার সাথে সাথে সরাসরি ইনবক্সে নিয়ে যেতে চায়। এতে অন্যের চোখে বিষয়টি আসে না, আর স্ক্যামাররা চাপা পড়া প্রশ্নের সুযোগ নেন।
মেসেজ: যে সত্যি, সে প্রশ্নকে ভয় পায় না।
যদি কোনো পেজে প্রশ্ন করার সময় এমন আচরণ দেখা যায়, তাহলে বুঝে নিতে হবে—পেজটা পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নয়। সত্যি ব্যবসা সবসময় খোলাখুলি যোগাযোগ করতে চায়, কমেন্ট বা প্রশ্নের ভয় পায় না।
ইনবক্সে অস্বাভাবিক তাড়া
অনেক সময় দেখা যায়, কোনো ফেসবুক পেজ তৎক্ষণাৎ পেমেন্ট করার চাপ দেয়। তারা বলে—“এখনই পেমেন্ট করুন!” বা “আর ৫ মিনিট দেরি করলে অফার শেষ হয়ে যাবে!”। এই ধরনের বার্তা আমাদের মনে ভয় বা তাড়া তৈরি করে, যাতে আমরা গভীরভাবে চিন্তা না করে সিদ্ধান্ত নেই। স্ক্যামাররা জানে, যত দ্রুত আপনি কাজ করবেন, তত সহজে তারা আপনাকে প্রতারিত করতে পারবে। তাই তারা সময়সীমা ব্যবহার করে মানসিক চাপ তৈরি করে।

মেসেজ: স্ক্যামার সবসময় আপনাকে ভাবার সময় দেয় না।
সুতরাং, কোনো অফার বা অফারের সময়সীমা দেখে হুট করে পেমেন্ট করা ঠিক নয়। প্রথমে যাচাই করুন, রিভিউ দেখুন, এবং সতর্ক থাকুন।
পেমেন্ট পদ্ধতি সন্দেহজনক
ফেসবুক পেজ থেকে প্রতারণার সবচেয়ে বড় লক্ষণগুলোর একটা হলো সন্দেহজনক পেমেন্ট সিস্টেম। অনেক পেজ শুধু ব্যক্তিগত বিকাশ বা নগদ নম্বর দেয়, যেটা কোনো ব্যক্তি বা অজানা নামের। তারা কোনো অফিসিয়াল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, কোম্পানির নাম, বা পেমেন্ট গেটওয়ের তথ্য দিতে চায় না।
আরও একটা বিষয় হলো—এই ধরনের পেজ থেকে টাকা পাঠানোর পর কোনো রিসিট বা অফিসিয়াল ইনভয়েস পাওয়া যায় না। শুধু ইনবক্সে “পেমেন্ট হয়ে গেছে” বলেই দায়িত্ব শেষ। ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা হলে প্রমাণ দেখানোর মতো কিছুই থাকে না। এছাড়া, বেশিরভাগ স্ক্যাম পেজেই ক্যাশ অন ডেলিভারি অপশন থাকে না। কারণ পণ্য হাতে দেওয়ার সময় টাকা নিলে প্রতারণা করা কঠিন হয়ে যায়। তাই তারা আগেই পুরো টাকা আদায় করতে চায়।
মেসেজ: পেমেন্ট যত অস্বচ্ছ, প্রতারণার ঝুঁকি তত বেশি।
তাই যেকোনো ফেসবুক পেজে পেমেন্ট করার আগে ভালোভাবে যাচাই করা খুব জরুরি। সম্ভব হলে ক্যাশ অন ডেলিভারি বেছে নিন, অফিসিয়াল রিসিট চান, আর সন্দেহ হলে লেনদেন এড়িয়ে চলুন।

শেষ মন্তব্য
ফেসবুক ব্যবহার করা খারাপ কিছু নয়। সত্যি কথা বলতে, এটি আমাদের জীবন অনেক সহজ করে দিয়েছে—বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ, নতুন প্রোডাক্ট খোঁজা, এমনকি ব্যবসার সুযোগও। কিন্তু সমস্যা তখনই আসে যখন ভুল জায়গায় বিশ্বাস করি। এক মুহূর্তের অযত্নে নেওয়া সিদ্ধান্ত আমাদের বিপদে ফেলতে পারে।
আজকে আমরা যে ৫টি লক্ষণ দেখলাম—অস্বাভাবিক লোভনীয় অফার, অসম্পূর্ণ তথ্য, কমেন্ট বা প্রশ্নের নিয়ন্ত্রণ, ইনবক্সে তাড়া, এবং সন্দেহজনক পেমেন্ট পদ্ধতি—সেগুলো মাথায় রাখলেই আপনি অনেক স্ক্যাম থেকে সহজেই বাঁচতে পারবেন।
Read More : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণা
বিশেষ দ্রষ্টব্য:
সুতরাং মনে রাখুন, সতর্ক থাকলেই বিপদ এড়িয়ে চলা সম্ভব। এই লেখা শেয়ার করুন, যাতে আপনার বন্ধুরাও সচেতন হয়। কমেন্টে লিখুন—আপনি কখনো ফেসবুক পেজে প্রতারিত হয়েছেন কি না, আর কোন ধরনের স্ক্যাম দেখা গেছে আপনার সামনে।
Reference: ফেসবুক



