আমরা সবাই মানুষ—এই কথাটা আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু সত্যিই কি আমরা সবাই এক? সুখের সময় তো অনেকেই পাশে থাকে, হাসি-আড্ডা, আনন্দ ভাগাভাগি সহজ। কিন্তু যখন দুঃখ আসে, বিপদ আসে, তখন কি সবাই একসাথে থাকি? কেউ যখন অভাবের কষ্টে পড়ে, কেউ যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সব হারায়, কিংবা কেউ যখন যুদ্ধ, রোগ বা অন্য কোনো সংকটে পড়ে—তখন আমাদের মানবিকতা কতটা জেগে ওঠে, সেটাই আসল প্রশ্ন।
এই প্রশ্ন থেকেই আসে মানব সংহতির কথা। মানব সংহতি মানে শুধু কষ্ট দেখে আফসোস করা নয়, বা দু-চারটা সহানুভূতির কথা বলা নয়। এর মানে হলো—একজন মানুষ আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়াবে, তার কষ্টকে নিজের কষ্ট বলে ভাববে। দেশ, ভাষা, ধর্ম বা জাতির ভেদাভেদ ভুলে সবাই এক হয়ে মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোই হলো প্রকৃত মানব সংহতি।
এই কারণেই আন্তর্জাতিক মানব সংহতি দিবস এত গুরুত্বপূর্ণ। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীর সব মানুষ আসলে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। একজনের কষ্ট অন্য সবার দায়। এই দিবস আমাদের শেখায়, যদি আমরা একে অপরের পাশে দাঁড়াই, তাহলে দারিদ্র্য, বৈষম্য, যুদ্ধ কিংবা দুর্যোগের মতো বড় সমস্যাগুলোর মোকাবিলা করা সম্ভব। মানব সংহতি শুধু একটি দিনের কথা নয়, এটি হওয়া উচিত আমাদের প্রতিদিনের জীবনের চর্চা।
আন্তর্জাতিক মানব সংহতি দিবস কী
আন্তর্জাতিক মানব সংহতি দিবস হলো এমন একটি দিন, যেদিন সারা বিশ্বের মানুষকে একটাই কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়—আমরা সবাই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। এই দিবসটি প্রতি বছর ২০ ডিসেম্বর পালিত হয়। দিনটি নির্দিষ্ট করে রাখার মূল উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যেন বছরে অন্তত একদিন হলেও থেমে ভাবতে শেখে—আমি কি অন্য মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছি? আমি কি শুধু নিজের কথাই ভাবছি, নাকি সমাজের সবার কথা ভাবছি?
এই দিবসটি জাতিসংঘ ঘোষিত একটি আন্তর্জাতিক দিবস। জাতিসংঘ মনে করে, বিশ্বে দারিদ্র্য, বৈষম্য, যুদ্ধ, শরণার্থী সংকট কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ—এসব সমস্যার সমাধান কোনো একক দেশ বা একক মানুষ একা করতে পারে না। এসব সমস্যা মোকাবিলা করতে হলে দরকার পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা এবং একসাথে কাজ করার মানসিকতা। সেই ভাবনা থেকেই জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক মানব সংহতি দিবস ঘোষণা করে।
এই দিবসের মূল বার্তা হলো—বিশ্বজুড়ে মানুষে-মানুষে সহযোগিতা। এখানে শুধু নিজের দেশের মানুষের কথাই নয়, বরং অন্য দেশের, অন্য ভাষার, অন্য সংস্কৃতির মানুষের কথাও ভাবার আহ্বান জানানো হয়। কেউ যদি বিপদে পড়ে, সে যে দেশ বা জাতিরই হোক না কেন, তার পাশে দাঁড়ানোই মানবিকতার আসল পরিচয়। আন্তর্জাতিক মানব সংহতি দিবস আমাদের শেখায়, যদি আমরা সবাই একসাথে কাজ করি, তাহলে পৃথিবী আরও মানবিক, শান্তিপূর্ণ আর সুন্দর হয়ে উঠতে পারে।
Read More : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক প্রভাব
মানব সংহতি বলতে কী বোঝায়
মানব সংহতি বলতে আসলে বোঝায়—একজন মানুষের দুঃখ-কষ্টকে নিজের বলে অনুভব করা এবং সেই কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসা। এটা শুধু মুখে বলা ভালোবাসা বা মানবিকতার কথা নয়, বরং বাস্তব জীবনে তার প্রমাণ দেওয়া। যখন কেউ বিপদে পড়ে, তখন তার পাশে দাঁড়ানোই মানব সংহতির সবচেয়ে সহজ ও শক্তিশালী রূপ। বিপদ যেকোনো ধরনের হতে পারে—অভাব, অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ কিংবা সামাজিক অবহেলা। সেই মুহূর্তে কারো পাশে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে গেলে তার কষ্ট অনেকটাই হালকা হয়ে যায়।
মানব সংহতির সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো—এখানে ধনী-গরিব, দেশ-বিদেশ, ধর্ম-বর্ণের কোনো ভেদাভেদ নেই। মানব সংহতি আমাদের শেখায়, মানুষ আগে, পরিচয় পরে। একজন মানুষ কোন দেশের, কোন ধর্মের বা কোন শ্রেণির—এই প্রশ্নগুলো তখন গুরুত্ব হারায়, যখন সে কষ্টে থাকে। পৃথিবীর এক প্রান্তে কোনো মানুষ দুর্ভিক্ষে ভুগলে, আরেক প্রান্তের মানুষেরও দায়িত্ব থাকে তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। কারণ মানবিকতা কোনো সীমানা মানে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মানব সংহতি মানে শুধু সহানুভূতি নয়, বাস্তব সহযোগিতা। কষ্ট দেখে “খারাপ লাগছে” বলা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দু-একটা পোস্ট দেওয়াই যথেষ্ট নয়। প্রকৃত মানব সংহতি তখনই দেখা যায়, যখন আমরা সময় দিই, শ্রম দিই, কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ বা সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসি। ছোট একটি সাহায্যও কারো জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তাই মানব সংহতি হলো অনুভূতির পাশাপাশি কাজের মাধ্যমে মানবিকতা প্রকাশ করা—যেটা সমাজকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে নেয়।
অন্যদের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি
মানব সংহতি মানে শুধু সহমর্মিতা নয়, বরং কঠিন সময় অন্যের পাশে দাঁড়ানো। কখনো কোনো মানুষ বিপদে পড়ে, সে হয়তো সাহায্যের হাত বাড়ানোর জন্য কারো দিকে তাকাচ্ছে। সেই মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানো—ছোট কোনো কাজ হলেও—একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। আমরা যখন অন্যকে সাহায্য করি, তখন শুধু তাদের নয়, নিজের মধ্যেও ভালোবাসা এবং মানবিকতার বীজ বপন করি।
মানব সংহতি আর প্রযুক্তি
আজকের সময়ে প্রযুক্তি আমাদের অনেক সুবিধা দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া, মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম—এসব ব্যবহার করে আমরা দূরে থাকা মানুষকেও সাহায্য করতে পারি। কোনো দুর্যোগের সময় অনলাইনে চাহিদা ও সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, অসহায়দের খবর ছড়িয়ে দেওয়া, আর্থিক সহায়তা পাঠানো—এসবই মানব সংহতির আধুনিক রূপ। প্রযুক্তি যদি মানবিক কাজে ব্যবহার হয়, তাহলে দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব বা বৈষম্যের মতো সমস্যা মোকাবিলা করা আরও সহজ হয়।
মানব সংহতি আমাদের দায়িত্ব
মানব সংহতি শুধু ভালো কাজ করার সুযোগ নয়, বরং এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। প্রতিটি মানুষই সামাজিক জীবনের অংশ, আর সামাজিক জীবনে দায়িত্ব ছাড়া শান্তি বা উন্নতি সম্ভব নয়। তাই আমাদের উচিত ছোট ছোট উদ্যোগ থেকে শুরু করা—প্রতিবেশীর সাহায্য করা, অসহায় শিশুর শিক্ষায় হাত দেয়া, অথবা বয়স্কদের খেয়াল রাখা। যখন সবাই সামান্য কিছু করে, তখন মিলেই বড় পরিবর্তন আসে।
কেন এই দিবসটি গুরুত্বপূর্ণ
আন্তর্জাতিক মানব সংহতি দিবস গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো—আজকের বিশ্ব নানা সংকটে ভরা। একদিকে দারিদ্র্য বাড়ছে, অন্যদিকে যুদ্ধ, সহিংসতা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়ত বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কোথাও মানুষ না খেয়ে থাকছে, কোথাও আবার যুদ্ধের কারণে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে। বন্যা, ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগে মুহূর্তের মধ্যে মানুষের সবকিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে। এসব সমস্যার প্রভাব শুধু একটি দেশেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর প্রভাব পড়ে পুরো বিশ্বের ওপর।
এই বাস্তবতায় পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়—একা কেউ সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। কোনো ব্যক্তি, কোনো সমাজ বা কোনো দেশ একা চাইলেই দারিদ্র্য দূর করতে পারে না, যুদ্ধ থামাতে পারে না বা দুর্যোগের ক্ষতি সামলাতে পারে না। এসব বড় সমস্যার মোকাবিলা করতে হলে দরকার সম্মিলিত প্রচেষ্টা, পারস্পরিক সহযোগিতা আর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। একজনের শক্তি সীমিত, কিন্তু সবাই মিলে কাজ করলে সেই শক্তিই অনেক গুণ বেড়ে যায়।
এ কারণেই বলা হয়—একসাথে থাকলেই বড় পরিবর্তন সম্ভব। যখন মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়ায়, তখন অসম্ভবও সম্ভব হয়ে ওঠে। ছোট ছোট সহযোগিতা মিলেই বড় সমাধান তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক মানব সংহতি দিবস আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়—যদি আমরা বিভেদ ভুলে একসাথে কাজ করি, তাহলে পৃথিবীর বড় বড় সমস্যাগুলোরও সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এই দিবস আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়, শুধু নিজের কথা না ভেবে, পুরো মানবজাতির কল্যাণে ভাবতে।
বাস্তব জীবনের উদাহরণ
মানব সংহতি শুধু বইয়ের পাতায় বা বক্তৃতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—বাস্তব জীবনে এর অসংখ্য উদাহরণ আমরা প্রতিদিনই দেখি। বিশেষ করে যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসে, তখন মানব সংহতির আসল রূপ সামনে আসে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প বা ভূমিধসের মতো দুর্যোগে বহু মানুষ এক মুহূর্তে ঘরবাড়ি, খাবার আর নিরাপত্তা হারিয়ে ফেলে। সেই সময় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ একসাথে ত্রাণ সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে। কেউ খাবার দেয়, কেউ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে, কেউ আবার নিজের সময় আর শ্রম দিয়ে বিপদগ্রস্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ায়—এটাই মানব সংহতির বাস্তব উদাহরণ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো যুদ্ধাহত শিশুদের সাহায্য। যুদ্ধের কোনো দায় না থাকলেও সবচেয়ে বেশি কষ্ট ভোগ করে শিশুরা। অনেক শিশু আহত হয়, পরিবার হারায়, শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবন থেকে বঞ্চিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও মানবিক সংস্থা এসব শিশুদের চিকিৎসা, খাদ্য, শিক্ষা এবং মানসিক সহায়তা দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসে। ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা হলেও মানুষ তখন একটাই পরিচয়ে পরিচিত হয়—মানুষ হিসেবে।
এছাড়া করোনা বা অন্য যেকোনো মহামারির সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানব সংহতির একটি বড় উদাহরণ। সেই কঠিন সময়ে অনেক মানুষ চাকরি হারিয়েছিল, অনেক পরিবার চিকিৎসার অভাবে ভেঙে পড়েছিল। তখন দেখা গেছে—ডাক্তার, নার্স, স্বেচ্ছাসেবকরা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের সেবা করেছে। অনেকেই বিনা পয়সায় অক্সিজেন, ওষুধ, খাবার বা আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, সংকট যত বড়ই হোক, মানুষ যদি একে অপরের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে সেই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
বাংলাদেশ ও মানব সংহতি
বাংলাদেশ মানব সংহতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। আমাদের দেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ হলেও, বিপদের সময় মানুষের সহযোগিতার মানসিকতা সত্যিই প্রশংসনীয়। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা জলোচ্ছ্বাসের সময় আমরা বারবার দেখেছি—মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে। কেউ নিজের নৌকা দিয়ে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করেছে, কেউ ঘর খুলে দিয়েছে আশ্রয়ের জন্য, আবার কেউ নিজের খাবার ভাগ করে নিয়েছে বিপদে পড়া প্রতিবেশীদের সঙ্গে। এসব ছোট ছোট উদ্যোগই মানব সংহতির বড় দৃষ্টান্ত তৈরি করে।
এই সময়গুলোতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ভূমিকাও খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রেড ক্রিসেন্ট, বিভিন্ন এনজিও, যুব সংগঠন ও সামাজিক সংগঠনগুলো দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ, চিকিৎসা সেবা ও পুনর্বাসনের কাজে এগিয়ে আসে। অনেক তরুণ স্বেচ্ছাসেবক নিজের পড়াশোনা বা কাজের ফাঁকে ঝুঁকি নিয়ে দুর্গত এলাকায় গিয়ে মানুষের সেবা করে। তাদের এই নিঃস্বার্থ পরিশ্রম প্রমাণ করে—মানব সংহতি শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি কাজের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
সবচেয়ে আশার কথা হলো, সাধারণ মানুষের মানবিক উদ্যোগ। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো বড় সংগঠন নয়—একজন সাধারণ মানুষই প্রথম সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাহায্যের আবেদন করে, কেউ নিজ উদ্যোগে টাকা তুলে ত্রাণ পাঠায়, কেউ আবার অসহায় শিশুর পড়াশোনার দায়িত্ব নেয়। এসব উদ্যোগ দেখলেই বোঝা যায়, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে মানবিকতা আর সংহতির শক্ত ভিত গড়ে উঠেছে। এই মানবিক মানসিকতাই আমাদের সমাজকে আরও শক্তিশালী ও সুন্দর করে তুলছে।
Read More : ইউরোপিয়ান ক্লায়েন্ট টার্গেট করার সহজ স্ট্র্যাটেজি
তরুণ সমাজের ভূমিকা
মানব সংহতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তরুণ সমাজের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তরুণরাই সমাজের শক্তি, পরিবর্তনের চালিকাশক্তি। তাদের মধ্যে আছে উদ্যম, সাহস আর নতুন কিছু করার মানসিকতা। যখন তরুণরা মানবিক কাজে এগিয়ে আসে, তখন সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন খুব দ্রুত দেখা যায়। তাই মানব সংহতির চর্চায় তরুণদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
তরুণরা সহজেই স্বেচ্ছাসেবী কাজে যুক্ত হতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শীতকাল, রক্তদান কর্মসূচি কিংবা স্বাস্থ্যসেবার মতো মানবিক কাজে তরুণদের উপস্থিতি সবসময়ই চোখে পড়ে। অনেক তরুণ নিজ উদ্যোগে দল গঠন করে ত্রাণ বিতরণ করে, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়। এসব কাজ শুধু অন্যদের উপকারই করে না, বরং তরুণদের নিজের মধ্যেও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলে।
বর্তমান যুগে তরুণদের আরেকটি বড় শক্তি হলো অনলাইনে সচেতনতা তৈরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তারা খুব সহজেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। কেউ যদি বিপদে পড়ে, তখন একটি পোস্ট বা শেয়ার অনেক সময় বড় সহায়তায় রূপ নেয়। অন্যায়, বৈষম্য বা মানবিক সংকটের বিরুদ্ধে তরুণরা অনলাইনে কথা বলে, মানুষকে সচেতন করে—এটাও মানব সংহতির একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো। এটা শুধু বড় কোনো কাজ হতে হবে এমন নয়। কখনো একজন দরিদ্র শিশুর পড়াশোনায় সাহায্য করা, কখনো একজন বৃদ্ধের ওষুধ কিনে দেওয়া, কিংবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়া কাউকে একটু সাহস দেওয়া—এই ছোট ছোট কাজগুলোর মধ্য দিয়েই মানব সংহতির আসল চর্চা হয়। তরুণ সমাজ যদি এই মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসে, তাহলে ভবিষ্যৎ পৃথিবী আরও মানবিক ও সুন্দর হবে।
আমাদের করণীয়
মানব সংহতি শুধু অন্যদের কথা ভাবার বিষয়ই নয়, এটি আমাদের নিজের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হওয়া উচিত। কিন্তু অনেক সময় মনে হয়, আমরা কি কিছু করতে পারি? এই ভেবে হাল ছাড়া যায়। সত্যিকারের মানব সংহতি শুরু হয় ছোট ছোট কাজ থেকেই। বড় কোনো কাজ করতে হবে এমন নয়—একজন প্রতিবেশীর জন্য খাবার রাখা, স্কুলের শিশুদের পড়াশোনায় সাহায্য করা, কোনো অসহায় ব্যক্তির পাশে দাঁড়ানো—এই সব ছোট উদ্যোগই মানবিক পৃথিবী গড়ার বড় ভিত্তি তৈরি করে। ছোট কাজগুলোই একে একে বড় পরিবর্তনে পরিণত হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সাহায্যের হাত বাড়ানো। যখন আমরা নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী অন্যকে সাহায্য করি, তখন শুধু তাদের জীবন সহজ হয় না, বরং আমাদের সমাজও আরও বন্ধুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী হয়। সাহায্য মানে শুধুমাত্র অর্থ বা জিনিস দেওয়া নয়, সময় দেওয়া, মনোযোগ দেওয়া বা কাউকে মানসিক সমর্থন দেওয়া—সবকিছুই মানব সংহতির অংশ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমাদের চিন্তাধারা হতে হবে ঘৃণা নয়, ভালোবাসা ছড়ানো। ভেদাভেদ, বিদ্বেষ বা বঞ্চনা যতই থাকুক, মানব সংহতি মানে হলো ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং সৌহার্দ্য ছড়ানো। একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ এবং মানুষের প্রতি বিশ্বাস বজায় রাখলেই সমাজে শান্তি ও সংহতি বজায় থাকে। ছোট ছোট উদ্যোগ এবং ভালোবাসার মাধ্যমে আমরা পৃথিবীকে আরও সুন্দর, নিরাপদ এবং মানবিক করে তুলতে পারি।
উপসংহার
মানব সংহতি শুধু একদিনের বিষয় নয়। এটি কোনো উৎসব বা দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনের অংশ হওয়া উচিত। আমাদের প্রতিদিনের কাজ, চিন্তা এবং আচরণেই এই মানবিকতার প্রকাশ থাকা দরকার। ছোট ছোট কাজ, সাহায্যের হাত বাড়ানো, অন্যের কষ্ট বোঝা—এসবই হলো মানব সংহতির বাস্তব চর্চা।
যখন আমরা শুধু নিজের কথা ভাবি না, অন্যের কষ্টে সাড়া দিই, তখন সমাজে ভালোবাসা এবং বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হয়। একে অপরের পাশে দাঁড়ানো, ঘৃণা নয় বরং ভালোবাসা ছড়ানো—এই দৃষ্টিভঙ্গিই মানবজাতিকে শক্তিশালী করে।
শেষ পর্যন্ত, মানবিক হলেই সুন্দর হবে পৃথিবী। যদি আমরা সবাই একে অপরের পাশে দাঁড়াই, ছোট বা বড়—সকল ধরনের সাহায্য করি, তবে দারিদ্র্য, দুর্যোগ, যুদ্ধ বা বৈষম্যর মতো চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা সহজ হয়ে যাবে। মানব সংহতি মানে হলো একে অপরের পাশে থাকা, একে অপরকে বোঝা, এবং একে অপরকে সাহায্য করা—এটাই পৃথিবীকে সত্যিকার অর্থে সুন্দর, শান্তিপূর্ণ এবং মানবিক করে তোলে।
Reference: আন্তর্জাতিক মানব সংহতি দিবস



