শবে বরাত মুসলমানদের কাছে একটি বিশেষ ও ফজিলতপূর্ণ রাত। ইসলামি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এটি শাবান মাসের ১৫ তারিখের রাত। এই রাতকে অনেকেই ক্ষমা, রহমত ও নাজাতের রাত হিসেবে মনে করেন। “শব” শব্দের অর্থ রাত এবং “বরাত” অর্থ মুক্তি বা নাজাত। অর্থাৎ শবে বরাত এমন একটি রাত, যেদিন বান্দারা আল্লাহর কাছে নিজেদের গুনাহ থেকে মুক্তির জন্য দোয়া করে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে।
ইসলামে এই রাতের গুরুত্ব অনেক। হাদিসে উল্লেখ আছে যে, এই রাতে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত দান করেন এবং তাঁর বান্দাদের ক্ষমা করে দেন—তবে যারা শিরক করে বা মানুষের সঙ্গে হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করে, তারা এই ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তাই এই রাত আমাদের জন্য আত্মসমালোচনার, নিজের ভুল-ত্রুটি বুঝে সংশোধনের এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার একটি বড় সুযোগ।
এই রাতকে ফজিলতপূর্ণ বলা হয় কারণ এটি ইবাদত, তওবা ও দোয়ার বিশেষ সময়। অনেক মুসলমান এই রাতে নফল নামাজ পড়েন, কোরআন তিলাওয়াত করেন, জিকির করেন এবং বেশি বেশি ইস্তেগফার করেন। তারা বিশ্বাস করেন, এই রাতে আন্তরিকভাবে দোয়া করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। তাই এটি শুধু একটি সাধারণ রাত নয়, বরং আত্মশুদ্ধির এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
মুসলমানদের কাছে শবে বরাতের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। এই রাত তাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং আল্লাহর কাছে ফিরে যেতেই হবে। তাই গাফেল না থেকে এই রাতকে ইবাদতের মাধ্যমে কাজে লাগানো উচিত। শবে বরাত আমাদের শেখায়—গুনাহ থেকে ফিরে এসে আল্লাহর রহমত লাভ করার দরজা সবসময় খোলা আছে, শুধু প্রয়োজন আন্তরিক তওবা ও সঠিক পথে চলার সংকল্প।

শবে বরাতের অর্থ ও পরিচয়
শবে বরাত শব্দটি মূলত ফারসি ভাষা থেকে এসেছে। এখানে “শব” অর্থ রাত এবং “বরাত” অর্থ মুক্তি, নাজাত বা পরিত্রাণ। অর্থাৎ শবে বরাত মানে হলো মুক্তির রাত বা নাজাতের রাত। ইসলামী পরিভাষায় এটি এমন একটি রাত, যেদিন বান্দারা আল্লাহর কাছে নিজেদের গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় তওবা করে, দোয়া করে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে। তাই এই রাতকে অনেকেই ক্ষমা ও রহমতের বিশেষ রাত হিসেবে মনে করেন।
শবে বরাত আরবি মাস শাবান-এর ১৫ তারিখের রাত। ইসলামি চান্দ্র বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী শাবান মাস হলো রমজানের আগের মাস। এই মাসকে প্রস্তুতির মাসও বলা হয়, কারণ রমজানের আগমনের আগে মুসলমানরা নিজেদের ইবাদতে মনোযোগী করার চেষ্টা করে। শাবান মাসের মাঝামাঝি এই রাতটি তাই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
কোরআনে সরাসরি “শবে বরাত” শব্দটি উল্লেখ না থাকলেও কিছু আলেম সূরা আদ-দুখানের একটি আয়াতের ব্যাখ্যায় এই রাতের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। হাদিসে বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, শাবান মাসের মধ্যরাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত নাজিল করেন এবং ক্ষমা করে দেন—তবে শিরককারী ও হিংসা-বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তিরা এই ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শবে বরাত ইসলামী ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাত, যা মুসলমানদের কাছে তওবা, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির একটি বড় সুযোগ হিসেবে বিবেচিত। এই রাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আল্লাহর দরবারে ফিরে আসার সুযোগ সবসময় খোলা, আর এই বিশেষ রাত সেই সুযোগকে আরও বেশি স্মরণ করিয়ে দেয়।
Read More : ঈদুল ফিতর: আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও সামাজিক শিক্ষা
শবে বরাতের ফজিলত
শবে বরাতকে মুসলমানরা এক বরকতময় ও ফজিলতপূর্ণ রাত হিসেবে মানেন। হাদিসে বর্ণিত আছে যে, শাবান মাসের মধ্যরাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত নাজিল করেন। এই রাতে অসংখ্য মানুষ আল্লাহর দয়ার ছায়ায় আসে এবং তাঁর ক্ষমা লাভ করে। তাই অনেকেই এই রাতকে রহমত ও মাগফিরাতের রাত বলে থাকেন। এটি এমন একটি সময়, যখন বান্দা যদি আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তাহলে তার জন্য ক্ষমার দরজা খুলে যেতে পারে।
এই রাত বান্দার গুনাহ মাফের একটি বড় সুযোগ। মানুষ হিসেবে আমরা ভুল করি, পাপ করি, অবহেলায় সময় নষ্ট করি। কিন্তু শবে বরাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু ও ক্ষমাশীল। যদি কেউ সত্যিকারভাবে তওবা করে, নিজের ভুল স্বীকার করে এবং আর গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প নেয়, তাহলে আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করতে পারেন। তবে হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে, যারা আল্লাহর সাথে শরিক করে বা মানুষের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করে, তারা এই ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তাই শুধু ইবাদত নয়, অন্তর পরিষ্কার করাও জরুরি।
তাকদির বা ভাগ্য নির্ধারণের বিষয়টি নিয়ে ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এই রাতে আগামী বছরের কিছু বিষয় নির্ধারণ বা প্রকাশ করা হয়। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন, কারণ কোরআনে স্পষ্টভাবে শবে বরাতের সাথে তাকদির নির্ধারণের কথা উল্লেখ নেই। তাই এ বিষয়ে বাড়াবাড়ি না করে সংযত ও সতর্ক থাকা উচিত। মূল গুরুত্ব হওয়া উচিত ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির দিকে।
শবে বরাতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—বেশি বেশি দোয়া ও ইবাদতে মন দেওয়া। এই রাতে নফল নামাজ পড়া, কোরআন তিলাওয়াত করা, জিকির করা এবং ইস্তেগফার করা অত্যন্ত উত্তম কাজ। পাশাপাশি নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং সমগ্র উম্মাহর জন্য দোয়া করা উচিত। কারণ দোয়া হলো মুমিনের শক্তিশালী অস্ত্র। শবে বরাত আমাদের শেখায়, আল্লাহর কাছে ফিরে আসার জন্য বিশেষ কোনো সময়ের অপেক্ষা না করে, এই বরকতময় রাতকে কাজে লাগিয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করার সংকল্প নিতে হবে।
এই রাতে করণীয় আমল
শবে বরাত এমন একটি রাত, যখন একজন মুসলমান চাইলে নিজের জীবনকে নতুনভাবে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তাই এই রাতে বেশি বেশি ইবাদত ও ভালো কাজ করার চেষ্টা করা উচিত। তবে সবকিছুই করতে হবে আন্তরিকতা ও নিয়তের বিশুদ্ধতার সাথে, লোক দেখানোর জন্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।
প্রথমত, এই রাতে নফল নামাজ পড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। কেউ চাইলে একা একা ঘরে বসে নফল নামাজ আদায় করতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম নেই, তাই সামর্থ্য অনুযায়ী দুই রাকাত, চার রাকাত বা তার বেশি নামাজ পড়া যায়। নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে নিজের ভুল স্বীকার করা এবং হেদায়েত চাওয়া সবচেয়ে উত্তম কাজগুলোর একটি।
দ্বিতীয়ত, কোরআন তিলাওয়াত করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। কোরআন হলো হিদায়াতের কিতাব। এই রাতে কিছু সময় নিয়ে মনোযোগ দিয়ে কোরআন পড়া, তার অর্থ বোঝার চেষ্টা করা এবং নিজের জীবনে তা বাস্তবায়নের সংকল্প নেওয়া উচিত। এতে অন্তর শান্ত হয় এবং ঈমান মজবুত হয়।
দোয়া ও ইস্তেগফার এই রাতের অন্যতম প্রধান আমল। বেশি বেশি “আস্তাগফিরুল্লাহ” পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া, নিজের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে ভালো পথে চলার অঙ্গীকার করা খুবই জরুরি। পাশাপাশি নিজের পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করা উচিত। আন্তরিক দোয়া কখনোই বিফলে যায় না।

জিকিরও এই রাতের একটি সুন্দর আমল। “সুবহানাল্লাহ”, “আলহামদুলিল্লাহ”, “আল্লাহু আকবার” ইত্যাদি জিকির বেশি বেশি পড়লে অন্তর নরম হয় এবং আল্লাহর স্মরণে মন ভরে ওঠে। জিকির মানুষের মনকে গুনাহ থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করে। অনেকে এই রাতে মৃতদের জন্য দোয়া করেন এবং কবর জিয়ারত করতে যান। মৃত আত্মীয়স্বজনের জন্য মাগফিরাত কামনা করা একটি ভালো কাজ। কারণ তারা দুনিয়ার কাজ শেষ করে চলে গেছেন, এখন আমাদের দোয়া তাদের উপকারে আসতে পারে। তবে সবকিছুই শান্ত ও শালীনভাবে করা উচিত।
শবে বরাতের পরের দিন অর্থাৎ শাবান মাসের ১৫ তারিখে রোজা রাখার কথাও অনেকেই বলেন। কিছু হাদিসে শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখার কথা উল্লেখ আছে। তাই কেউ যদি পরের দিন নফল রোজা রাখে, তা সওয়াবের কাজ হতে পারে। তবে এটিকে ফরজ বা বাধ্যতামূলক মনে করা ঠিক নয়। সব মিলিয়ে বলা যায়, শবে বরাত হলো ইবাদত, তওবা ও আত্মশুদ্ধির রাত। এই রাতে যতটা সম্ভব আল্লাহর দিকে মনোযোগী হওয়া এবং নিজের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করার সংকল্প নেওয়াই সবচেয়ে বড় আমল।
আমাদের সমাজে শবে বরাতের প্রচলিত কিছু কাজ
শবে বরাতকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে বিভিন্ন ধরনের প্রচলিত আমল ও সামাজিক রীতি দেখা যায়। এর মধ্যে কিছু কাজ ধর্মীয়ভাবে উৎসাহিত, আবার কিছু কাজ কেবল সামাজিক প্রথা হিসেবে চালু হয়েছে। তাই কোনটি ইবাদত আর কোনটি শুধু সংস্কৃতি—এই বিষয়টি বুঝে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, শবে বরাতের রাতে অনেকেই মসজিদে গিয়ে ইবাদত করেন। মসজিদে নফল নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়ার আয়োজন করা হয়। অনেকে সারা রাত জেগে ইবাদত করেন। এটি একটি ভালো দিক, কারণ মানুষ অন্তত এই রাতকে কেন্দ্র করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার চেষ্টা করে। তবে মনে রাখতে হবে, ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা, তাই তা হতে হবে আন্তরিকভাবে, দেখানোর জন্য নয়।
দ্বিতীয়ত, কবর জিয়ারত আমাদের সমাজে শবে বরাতের একটি প্রচলিত কাজ। অনেকে এই রাতে কবরস্থানে গিয়ে মৃত আত্মীয়দের জন্য দোয়া করেন। ইসলামেও কবর জিয়ারতের অনুমতি রয়েছে, কারণ এটি মানুষের মনে আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে কবর জিয়ারতের সময় অতিরঞ্জন, অশোভন আচরণ বা কুসংস্কার থেকে দূরে থাকা জরুরি। কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শুধু দোয়া ও শিক্ষা গ্রহণ।
তৃতীয়ত, হালুয়া-রুটি বা বিভিন্ন খাবার তৈরি ও বিতরণের রীতি আমাদের দেশে বেশ প্রচলিত। অনেক পরিবার এই রাতে বিশেষ খাবার রান্না করে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মাঝে বিতরণ করে। এটি সামাজিক সৌহার্দ্য ও ভালোবাসা বৃদ্ধির একটি দিক হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, এটি কোনো ফরজ বা বাধ্যতামূলক ধর্মীয় কাজ নয়। কেউ করলে ভালো নিয়তে করবে, আর না করলে তাকে দোষ দেওয়া উচিত নয়।
সবশেষে, আতশবাজি বা অতিরিক্ত খরচের বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কিছু জায়গায় শবে বরাতকে আনন্দের উৎসব মনে করে আতশবাজি ফোটানো বা অপ্রয়োজনীয় খরচ করা হয়। এতে শব্দদূষণ, পরিবেশদূষণ এবং অর্থের অপচয় ঘটে। ইসলাম অপচয় সমর্থন করে না। তাই এই রাতকে আনন্দ-উৎসবের পরিবর্তে ইবাদত, আত্মসমালোচনা ও দোয়ার মাধ্যমে পালন করাই উত্তম।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শবে বরাতের সঙ্গে জড়িত সামাজিক কাজগুলোর মধ্যে ভালো দিকগুলো গ্রহণ করা উচিত এবং অপ্রয়োজনীয় বা বাড়াবাড়ি কাজগুলো থেকে বিরত থাকা উচিত। তাহলেই এই রাতের প্রকৃত শিক্ষা ও মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব হবে।
Read More : রমজান আত্মশুদ্ধি, সংযম ও রহমতের মাস
শবে বরাতের শিক্ষা
শবে বরাত শুধু একটি ফজিলতপূর্ণ রাত নয়, এটি আমাদের জীবনের জন্য গভীর শিক্ষা বহন করে। এই রাত মানুষকে নিজের ভেতরে তাকাতে শেখায়, ভুলগুলো চিনতে শেখায় এবং নতুনভাবে জীবন শুরু করার সাহস দেয়। তাই শবে বরাতের আসল সৌন্দর্য শুধু কিছু আনুষ্ঠানিকতায় নয়, বরং এর ভেতরের শিক্ষায়।

প্রথমত, শবে বরাত আমাদের আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়। আমরা অনেক সময় ব্যস্ততার কারণে নিজের ভুল-ত্রুটি নিয়ে ভাবি না। কিন্তু এই রাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নিজের হিসাব নিজেকেই নিতে হবে। আমরা কী করছি, কেমন জীবন কাটাচ্ছি, আল্লাহর আদেশ মানছি কি না—এসব বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার সময় হলো শবে বরাত। আত্মশুদ্ধি মানে শুধু বাহ্যিক পরিবর্তন নয়, অন্তরের পরিবর্তন। হিংসা, অহংকার, রাগ, বিদ্বেষ—এসব দূর করে হৃদয়কে পরিষ্কার করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, এই রাত পাপ থেকে ফিরে আসার বড় সুযোগ। মানুষ ভুল করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভুলের ওপর অটল থাকা ঠিক নয়। শবে বরাত আমাদের শেখায়—যত বড় গুনাহই হোক না কেন, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও বড়। যদি আমরা সত্যিকারভাবে অনুতপ্ত হই এবং আর সেই ভুল না করার সংকল্প করি, তাহলে আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করতে পারেন। তাই এই রাত হলো নতুন করে সৎ পথে চলার প্রতিজ্ঞার সময়।
তৃতীয়ত, শবে বরাত আল্লাহর দিকে ফিরে আসার বিশেষ সুযোগ তৈরি করে। আমরা অনেক সময় দুনিয়ার কাজে এত ব্যস্ত হয়ে যাই যে, ইবাদত ও আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরে যাই। এই রাত আমাদের আবার সেই সম্পর্ককে দৃঢ় করতে আহ্বান জানায়। নামাজ, কোরআন, দোয়া ও জিকিরের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নিকটবর্তী হতে পারি। এই নৈকট্যই একজন মুমিনের জীবনের আসল শক্তি।
সবশেষে, শবে বরাত আমাদের ক্ষমা ও দয়ার শিক্ষা দেয়। যেমন আমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, তেমনি আমাদেরও উচিত অন্যকে ক্ষমা করা। কারও প্রতি হিংসা বা রাগ পুষে রাখা নয়, বরং মন পরিষ্কার করা। কারণ অন্তর পরিষ্কার না হলে প্রকৃত শান্তি পাওয়া যায় না। শবে বরাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দয়া, সহানুভূতি ও ক্ষমাশীলতাই একজন ভালো মানুষের আসল পরিচয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শবে বরাত কেবল একটি রাত নয়, এটি আত্মপরিবর্তনের আহ্বান। যে এই রাতের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, তার জীবনই বদলে যেতে পারে।
উপসংহার
শবে বরাত শুধু আনন্দ করার বা বিশেষ কিছু আয়োজনের রাত নয়। এটি মূলত একটি আত্মজাগরণের রাত। অনেকেই এই রাতকে শুধু হালুয়া-রুটি, আলো কিংবা সামাজিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। কিন্তু এর আসল তাৎপর্য এর চেয়ে অনেক গভীর। এই রাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন খুবই ক্ষণস্থায়ী, আর আমাদের একদিন আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। তাই এই রাত কেবল আনন্দের নয়, বরং সচেতন হওয়ার রাত।
শবে বরাত হলো তওবা ও আত্মসমালোচনার বিশেষ সময়। আমরা সারা বছর কত ভুল করি, কত গুনাহে জড়িয়ে পড়ি—তা অনেক সময় বুঝতেই পারি না। এই রাত আমাদের থেমে যাওয়ার সুযোগ দেয়। নিজের জীবনকে নতুন করে যাচাই করার, নিজের কাজের হিসাব নেওয়ার এবং ভুল থেকে ফিরে আসার সুযোগ দেয়। আন্তরিকভাবে তওবা করলে আল্লাহ অবশ্যই তা কবুল করতে পারেন। তাই এই রাতকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
আমাদের উচিত এই বরকতময় রাতকে ইবাদতের মাধ্যমে কাজে লাগানো। বেশি বেশি নামাজ পড়া, কোরআন তিলাওয়াত করা, দোয়া ও ইস্তেগফার করা—এসবের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর কাছাকাছি যেতে পারি। পাশাপাশি নিজের অন্তরকে পরিষ্কার করা, মানুষের প্রতি বিদ্বেষ দূর করা এবং ভালো মানুষ হওয়ার সংকল্প নেওয়াও জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, শবে বরাত আমাদের জন্য এক মহান সুযোগ। যে এই সুযোগকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তার জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতেই পারে। তাই আসুন, এই রাতকে শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, সত্যিকার অর্থে আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়ার এক নতুন সূচনা হিসেবে গ্রহণ করি।
Reference: শবে বরাত
